1. m.milon77@gmail.com : Daily Mail 24.live : Daily Mail 24.live
  2. info@www.dailymail24.live : Daily Mail 24 :
শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৪৩ পূর্বাহ্ন

“তিন মুক্তিযোদ্ধার গল্প”

প্রতিবেদকের নাম:
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৪
  • ২৪১ বার পড়া হয়েছে

 

 

মোছাঃ সোহেলী লতিফা

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

 

“১৯৭১ সালে আমার মৃত্যু হওয়ার কথা, যখন পাকিস্তানী আর্মি প্লেয়ার দিয়ে আমার পায়ের নখ গুলো উপ্রে ফেলেছিলো এবং আমার পায়ে দু-দুটো গুলী করেছিলো সেদিনই মৃত্যু হওয়ার কথাছিলো আর এটাতো আমার বোনাস life, তাই আমার এই রোগ নিয়ে আমি মোটেও বিচলিত নই, আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবেনা, তুমি Americaতে অনেক ভাল থেকো আমি দোয়া করি,”

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ৩জন বীর মুক্তিযোদ্ধার গল্প লিখছি, না- এগুলো গল্প নয় বাস্তবতা। যা লিখতে আমার গা শিউরে উঠে, আমার লেখনীতে চলে আসে স্তব্ধতা। তবু পাঠকের জন্য লিখবো দু’লাইন!! একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি গর্বিত। আমার বাবা, শশুর ও চাচা শশুর এই ৩ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে আমার এই লেখা!!

………….…………………………………………..

১ম গল্প………

“মোঃ লুৎফর রহমান” আমার বাবা।

আমার বাবা অনেক শান্তশিষ্ট নরম স্বভাবের একজন ভালো মানুষ ছিলেন। এই নরম স্বভাবের মানুষটা মুক্তিযুদ্ধ করবে, সেটা কখনো কেউ কল্পনাও করেনি। বাড়িতেও কেউ চায়নি বাবা যুদ্ধে যাক। বাবার বয়স তখন ১৬/১৭ হবে। অল্প বয়সে রক্তে যুদ্ধের নেশা, দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। বাবা সবার অজান্তে পালিয়ে চলে যায় যুদ্ধে। 

তারপর ট্রেনিং শেষ করে যথারিতি যুদ্ধে নেমে পড়ে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে একবার নদীর পাড়ে শত্রুপক্ষের আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয় বাবাসহ তার সহযোদ্ধাদের। শত্রুপক্ষ সংখ্যায় বেশি বুঝতে পেরেও বাবা ও তার সহোযোদ্ধারা পিছু পা হননি। তাঁরা একটি ভাঙ্গা নৌকার আড়াল থেকে শত্রুর উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এক পর্যায়ে শত্রুরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার ১ মাস পর দেশ স্বাধীন হয়। তারপর অস্ত্র জমা দিতে গিয়ে বাবার পুলিশ বাহনিতে যোগ দেয় ৷ 

বাবার কাছে যুদ্ধের গল্প শুনতে চাইলে অনেক গল্পের মাঝে বাবা আমাদের এই গল্প শুনাতেন। আর গল্প বলার সময় বাবার মুখে এক অন্যরকম উজ্জ্বলতা কাজ করত। আজ বাবা আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি আছে আমাদের ও পুরো বাঙ্গালী জাতির অন্তরে। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমার বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন…

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

২য় গল্প………

“শেখ সুবেদ আলী” আমার শশুর।

আমার শশুর আর চাচা শশুর দু’জন এক সাথে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো। চাচা শশুরের গল্পটা পরে বলছি। আমার শশুরের অনেক যুদ্ধের গল্পের মাঝে একটা গল্প বলি। যুদ্ধের এক পর্যায়ে নিজ পাড়ায় শত্রু আক্রমণ করে নিজ পাড়াকে বাঁচাতে আমার শশুর,  তার ছোট ভাই ও সহযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুপক্ষের উপর। এক সময় শত্রুর দিকে গুলি ছুড়তে গিয়ে বন্দুকের বাটের ধাক্কায় ডান কলার বোনটা ভেঙ্গে যায় আমার শশুরের। শত্রুদের পরাজিত করে আমার শশুরের ছোট ভাই তাকে কাঁধে করে নিয়ে আসে বাসায়। জীবনের ঝুকি নিয়ে আমার শশুর তার পাড়াকে শত্রমুক্ত করেছেন। বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে আমার শশুর আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তিনি আছেন আমাদের অন্তরে, আমাদের জাতীয় চেতনা ও স্বত্বায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার শশুরকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন…

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

৩য় গল্প……..

“কালু মিঞা” আমার চাচা শশুর। গল্পটি তার ছেলে আলী হায়দার নিজামের লেখা থেকে সংগৃহীত।

১৯৭১ জুলাই  মাস। এর কোন একদিনে আমার বাবা ও তার সহ-যোদ্ধা একটি সংবাদ পান ধামুরহাট (নওগাঁ)এর কোন এক স্থানে কিছু রাজাকারের সহায়তায় তিন জন যুবতীকে দুই দিন যাবত পাকিস্তান মিলেটারী’রা অতাচার করছিল। ঐ সময় আমার বাবা তার প্লাটুন নিয়ে হিলী (দিনাজপুর) বর্ডারে অবস্থান করছিলেন। খবর শুনে তিনি তাঁর সহযোদ্ধারা ১০জনসহ ধামুরহাট এর উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রায় ৩৫ মাইল হেঁটেছেন তারা। তারপর এ্যাম্বুস করেতে শুরু করেন, পরনে লুঙ্গী গায়ে গেঞ্জি আর হাতে রাইফেল। সন্ধা ৭ টা বাজে। উদ্দেশ্য, কত জন পাকিস্তানি মিলেটারী ও রাজাকার আছে ঐ ক্যাম্পে সেটা জানা এবং এ্যাকশনে গিয়ে শত্রুদের ঘায়েল করা।

পাকিস্তানি মিলেটারী ও দুই রাজাকার মিলে তারা ২৭জন ছিল। প্রথমে ঐ দুই রাজাকারকে আমার বাবা ক্যাম্পের বাহিরে আটক করে। পরে ঐ দুই রাজাকারের গলায় ছুরি ধরে ক্যাম্পের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য নেন এবং এ্যাকশনে যান। উল্লেখ্য যে, আমার বাবা একজন গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন এবং তিনি জানতেন পাকিস্তান মিলিটারীরদের যুদ্ধের কৌশল তাই ঐ ক্যাম্প দখল করতে বেশী সময় প্রয়োজন হইনি তবে ঐ অপারেশনে আমার বাবার দুইজন সহযোগী মুক্তিযাদ্ধা শহীদ হন আর ঐ তিন জন যুবতির মধ্যে একজনকে একটি ঘরের ফ্যানের সঙ্গে বিবস্ত্র মৃত অবস্তায় ও অন্য দুইজনকে আরেকটি ঘর থেকে উদ্ধার করেন। 

ঐ অপারেশনের গল্পটা যদি ওখানেই শেষ হয়ে যেতো তাহলে তো ভালই হত কিন্তু গল্পটা সহজ ছিল না । আমি তখন হাই স্কুলে ১৯৯৩ সাল নানার বাড়ী বেড়াতে গিয়েছিলাম সঙ্গে আমার বাবাও ছিলেন। নানার বাড়ী থেকে ধামুরহাট বেশী দূরত্ব না, তাই বাবা আমাকে সঙ্গে নিয়ে এক সকালে নাস্তার জন্য ধামুরহাটে যান একটা রেস্টুরেন্টে।

বাপ-ছেলে পরাটা খাচ্ছিলাম হঠাৎ একজন লোক বাবাকে দেখে দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল, অনেকটা পালানোর মত। কিন্তু আমার বাবা তাকে চিনে ফেলেছিল তাই তিনি আমাকে বললেন, “তুমি খাও আমি আসছি ” বাবা অনেকটা উত্তেজিত আর সেই লোকটাকে একপলক দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। লোকটার গলায় অনেক বড় কাটা দাগ, ওরকম গলায় কাটা দাগ দেখলে যে কাউরও  গায়ে কাটা দিয়ে উঠবে । পাঁচ মিনিট পর বাবা ফিরে এলো। বাবা বলল, ধরতে পরলাম না। আমি বললাম কে আব্বা ? আমার বাবা বললো, “এই রাজাকারকে আমি ৭১ সালে অনেক খুঁজেছি পাইনি আজ বহুদিন পর তাকে পেয়েও হারালাম। ১৯৭১ সালে “আব্দুল আলিম” আমার মাথার মূল্য ১০,০০০ হাজার টাকা ঘোষনা করেছিল কারন আমিই জয়পুরহাট থানা দখল করে প্রথম বাংলাদেশ’র পতাকা উত্তলন করি । পরে “আব্দুল আলিম” (সাবেক রেল মন্ত্রী) পাকিস্তান মিলেটারীদের খবর দিয়ে আবারও জয়পুরহাট থানা দখলে নেয় । ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসম্বরে “আব্দুল আলিম”কে আমি আটক করেছিলাম এবং হত্যাও করতে চেয়েছিলাম কিন্তু ৭ নং সেক্টর এর নেতা “আব্দুল জলিল” (সাবেক আওয়ামীলীগ সংগঠনিক সম্পাদক ) ও মাহাতাব “আব্দুল আলিম”কে শুট করতে দেয়নি। আর এই রাজাকার সেই রাজাকার যে আমার কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল। বলেছিল “ভাই আমাকে মাফ করে দেন আমি ভয়ে রাজাকার হয়েছি”। আমি তার গলায় চুরি চালিয়েও আহত অবস্তায় ছেড়ে দিয়েছিলাম, পরে সে আব্দুল আলিম এর কাছে আমার অবস্থান ও ধামুরহাট ক্যাম্প দখলের সংবাদ জানায় এবং ঐ রাতে পাকিস্তানবাহিনী আমাদের ওপর আক্রমণ চলায় সেখানে আমার দলের সাতজন মুক্তিযাদ্ধা শহীদ হন। আমি আর “বুদু মন্ডা” নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও শেষ চেষ্টা করি। আমরা দু’জন একটি আখঁ ক্ষেতে ঢুকে পরি আমাদেরকে পাকিস্তান মিলেটারী চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে আল্লাহকে স্মরণ করি, কলিমাও পাঠ করি। হঠাৎ মাথা বুদ্ধি আসে পাশেই পুরাতন একটি কবর দেখতে পাই। আমি ঐ কবরের মাটি আর বাঁশ সরিয়ে কবরে ঢুকে পরি আমি সেখানে সারারাত পুরাতন লাশের সঙ্গে শুয়েছিলাম। কে একজন বলছিল, “এ ছালা বাংগাল কিধার গিয়া” আমার প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল কারন  কবরের মধ্যে লাল পিঁপড়া আমাকে কামড়াচ্ছিল। এভাবে ছয় ঘন্টা আমি পিঁপড়ার কামড় খেলেছিলাম। অবশেষে আমাকে খুঁজে না পেয়ে তারা চলে যায়, সেই যুদ্ধে আমিই শুধু বেঁচেছিলাম । আমার বাবা যখন আমাকে এই গল্প টা বলছিল বাবা’র চোখ তখন ছল-ছল করছিল । 

আজ আমার বাবার ৫ম মৃত্যু বাষির্কী। ২০১২ সালের ৫ই ফেবুরুয়ারী তিনি দেহত্যাগ করেন । ২০১১ সালে যখন তিনি ক্যান্সার এ আক্রান্ত হন, তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন “১৯৭১ সালে আমার মৃত্যু হওয়ার কথা, যখন পাকিস্তানী আর্মি প্লেয়ার দিয়ে আমার পায়ের নখ গুলো উপ্রে ফেলেছিলো এবং আমার পায়ে দু-দুটো গুলী করেছিলো সেদিনই মৃত্যু হওয়ার কথাছিলো আর এটাতো আমার বোনাস life, তাই আমার এই রোগ নিয়ে আমি মোটেও বিচলিত নই, আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবেনা, তুমি Americaতে অনেক ভাল থেকো আমি দোয়া করি,” এটাই তাঁর সাথে আমার শেষ কথা। আর হয়তো ১০ বৎসর পর আর একটাও মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাব না আমরা , যাই হোক  ৭ নং সেক্টর এর সোবরা সাব-সেক্টর কমান্ডার মরহুম কালু মিয়া তাঁর প্রত্যেকটি কর্মে কথায় সৎ থাকার চেষ্টা করেন। তিনিও আমাদের মাঝে নেই বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। কিন্তু তিনি আছে আমাদের ও পুরো বাঙ্গালী জাতির অন্তরে। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমার চাচা শশুরকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন…

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায়: 𝐘𝐄𝐋𝐋𝐎𝐖 𝐇𝐎𝐒𝐓